অলসতা মানেই শুধু শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা নয়; এটি অনেক সময় ক্লান্ত দেহ, অস্থির মন বা অনুপ্রেরণার অভাবের ইঙ্গিত দেয়। আধুনিক জীবনের চাপে আমরা প্রায়শই শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। তবে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিতে এমন কিছু কার্যকর পদ্ধতির উল্লেখ রয়েছে, যেগুলি নিয়মিত চর্চা করলে দেহ-মন পুনরায় প্রাকৃতিক ছন্দে ফিরে আসে এবং অলসতা দূর হয়। বিশেষ করে আয়ুর্বেদ, যোগ এবং বৈদিক শাস্ত্রে এমন অনেক সহজ অথচ গভীর প্রভাবযুক্ত উপায়ের কথা বলা হয়েছে, যেগুলি আজও প্রাসঙ্গিক।
চলুন জেনে নিই এমন ৫টি প্রাচীন ভারতীয় পদ্ধতি যা অলসতা দূর করে কর্মশক্তি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে—
১. উষাপান (রাতভর তামার পাত্রে রাখা পানি পান)
আয়ুর্বেদের গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ম হলো প্রতিদিন সকালে খালি পেটে তামার পাত্রে সারা রাত রাখা পানি পান করা, যাকে বলা হয় উষাপান। এই জল দেহের ত্রিদোষ—ভাত, পিত্ত ও কফ—এর ভারসাম্য রক্ষা করে, টক্সিন বের করে দেয় এবং হজম শক্তি ও মেটাবলিজম উন্নত করে।
তামার জলে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং জীবাণুনাশক উপাদান কোষ পুনর্গঠনে সাহায্য করে, ফলে দেহ ও মন সারা দিন সতেজ থাকে।
২. ব্রহ্ম মুহূর্তে জাগরণ
সূর্যোদয়ের প্রায় দেড় ঘণ্টা আগে যে সময়টি পড়ে, তাকে বলা হয় ব্রহ্ম মুহূর্ত। এই সময়ে উঠে ধ্যান, পড়াশোনা কিংবা পরিকল্পনা করলে মন ও মস্তিষ্ক স্বচ্ছ হয় এবং সৃজনশীলতাও বৃদ্ধি পায়।
প্রাচীন ঋষিরা মনে করতেন এই সময়ে জাগলে সার্কাডিয়ান রিদম ঠিক থাকে এবং দিন শুরু হয় এক নতুন প্রাণশক্তি নিয়ে।
৩. ত্রাটক (যোগের দৃষ্টি ধ্যান)
ত্রাটক হলো এমন একটি যোগমন্ত্র ধ্যান পদ্ধতি, যেখানে চোখ না ঝাপসিয়ে একটানা দীপশিখা বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।
মাত্র ১০ মিনিট ত্রাটক চর্চা করলে মনোযোগ বাড়ে, মানসিক ক্লান্তি দূর হয় এবং কাজের প্রতি মনসংযোগ গড়ে ওঠে। তৃতীয় নেত্র বা অজ্ঞান চক্র জাগ্রত করতেও এটি কার্যকর।
৪. বৈদিক মন্ত্র জপ বা শ্রবণ
প্রতিদিন গায়ত্রী মন্ত্রের মতো বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ বা শুনলে স্নায়ু শান্ত হয় এবং মনোসংযোগ বৃদ্ধি পায়। মন্ত্রের শব্দতরঙ্গ মস্তিষ্কের তরঙ্গের ভারসাম্য তৈরি করে, যা মানসিক চাপ কমিয়ে অভ্যন্তরীণ স্থিতি বজায় রাখে।
বিশেষ করে সকালে মৃদু সুরে মন্ত্র শ্রবণের অভ্যাস সারাদিন একটি ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৫. ঘাসে খালি পায়ে হাঁটা (পৃথ্বী স্নান)
সকালের ভেজা ঘাসের ওপর খালি পায়ে হাঁটা, যা আয়ুর্বেদে পৃথ্বী স্নান নামে পরিচিত, শরীরে প্রাকৃতিক শক্তির প্রবাহ তৈরি করে।
এই অভ্যাস মানসিক চাপ কমায়, ঘুমচক্র নিয়ন্ত্রণে আনে এবং শরীর-মনকে সতেজ রাখে। এছাড়া পায়ের পেশি ও স্নায়ুকে শক্তিশালী করে এবং দেহে ভারসাম্য বজায় রাখে।
অতিরিক্ত কার্যকর অভ্যাস: ভেষজ তেল মালিশ
প্রতিদিন সকালে সারা শরীরে উষ্ণ ভেষজ তেল দিয়ে মালিশ করলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, ক্লান্তি দূর হয় এবং মন চনমনে হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে মাথা, পা এবং পিঠে তেল মালিশ করলে স্নায়ু শান্ত হয়, টক্সিন বের হয় এবং শরীর ও মন কর্মশক্তিতে পূর্ণ হয়। আধুনিক গবেষণায়ও দেখা গেছে, নিয়মিত অভ্যঙ্গ মানসিক অবসাদ কমায় এবং ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করে।
প্রাচীন ভারতীয় এই পদ্ধতিগুলি আধুনিক জীবনযাত্রায় নিয়মিত প্রয়োগ করলে অলসতা দূর হয় এবং মন-দেহ উভয়ই সক্রিয় থাকে। আজকের বিজ্ঞানও এই পদ্ধতিগুলির কার্যকারিতা সমর্থন করছে। তাই প্রযুক্তি-নির্ভর জীবনে ফিরে তাকানো যেতেই পারে প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানের দিকে, যেখানে লুকিয়ে আছে প্রকৃত কর্মশক্তির চাবিকাঠি।
তথ্য সূত্র: টাইমস অফ ইন্ডিয়া
জিও নিউজ ২৪ ঘণ্টা বাংলার খবর